টেট ইস্যুতে ধ্বংসের মেঘ: শিক্ষামন্ত্রীর শেষ উত্তরে বিপাকে লক্ষ লক্ষ শিক্ষক পরিবারের ভবিষ্যৎ
ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব সংবাদদাতা | কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ| ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬— ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে দিনটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিল। লোকসভার বাজেট অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষা মন্ত্রকের লিখিত জবাব ঘিরে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালের আগে নিযুক্ত প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তুঙ্গে।
কেন্দ্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— টেট (TET) পাস বাধ্যতামূলক, এবং এই নিয়মে কোনও সার্বিক শিথিলতার পরিকল্পনা নেই। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে ৩১ আগস্ট ২০২৭-এর মধ্যে যোগ্যতা অর্জন না করলে চাকরি ও বেতন সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও সংসদে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
আরটিই আইন ও ২০১০ সালের এনসিটিই বিজ্ঞপ্তি: বিতর্কের সূত্রপাত
২০০৯ সালে পাশ হওয়া Right to Education (RTE) Act-এর ধারা ২৩ অনুযায়ী, ২৩ আগস্ট ২০১০-এ NCTE গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানায়— প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষক হতে গেলে Teacher Eligibility Test (TET) উত্তীর্ণ হওয়া আবশ্যিক।
সমস্যা তৈরি হয় তাঁদের ক্ষেত্রে, যাঁরা ২০১১ সালের আগে নিয়োগপ্রাপ্ত। তখন টেট চালু ছিল না। ফলে বহু অভিজ্ঞ শিক্ষক নতুন নিয়মের আওতায় পড়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। সংসদে সাংসদ লালজি বর্মা এই বৈষম্যের বিষয়টি উত্থাপন করেন।
লোকসভায় শিক্ষামন্ত্রকের স্পষ্ট জবাব: কোনও সার্বিক ছাড় নয়
শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী লিখিত জবাবে জানান—
টেট একটি সংবিধিবদ্ধ ন্যূনতম যোগ্যতা
এটি প্রশাসনিক শর্ত নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নের অংশ
২০১১-এর আগে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য কোনও ইউনিফর্ম ন্যাশনাল পলিসি বা সার্বিক অব্যাহতি দেওয়ার পরিকল্পনা নেই
এই অবস্থান কার্যত দীর্ঘদিনের ছাড়ের দাবিকে নাকচ করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ রায়: ৩১ আগস্ট ২০২৭ চূড়ান্ত সময়সীমা
সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের Article 142 প্রয়োগ করে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। মূল পয়েন্টগুলি হলো—
১️⃣ ৩১ আগস্ট ২০২৭ ডেডলাইন
যাঁদের চাকরির মেয়াদ ৫ বছরের বেশি বাকি, তাঁদের ৩১ আগস্ট ২০২৭-এর মধ্যে টেট পাস করতে হবে। তা না হলে চাকরি ও বেতন অব্যাহত রাখা কঠিন হতে পারে।
২️⃣ অবসরপ্রান্ত শিক্ষকদের ছাড়
যাঁদের অবসর ৫ বছরের মধ্যে, তাঁদের মানবিক কারণে টেট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাঁরা বর্তমান পদে থেকেই অবসর নিতে পারবেন।
৩️⃣ পদোন্নতিতে বাধা
টেট উত্তীর্ণ না হলে কোনও শিক্ষক পদোন্নতির জন্য যোগ্য হবেন না— সংসদীয় জবাবে এটি পরিষ্কার করা হয়েছে।
রাজ্য সরকারের রিভিউ পিটিশন খারিজ
পশ্চিমবঙ্গ সরকার সুপ্রিম কোর্টে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানালেও তা খারিজ হয়েছে। ফলে নিয়ম শিথিল করার সুযোগ কার্যত বন্ধ। সংসদে কেন্দ্র জানিয়েছে— আদালতের নির্দেশের পর কেন্দ্র বা রাজ্য কারও হাতে পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই।
শিক্ষক সমাজে উদ্বেগ, মানসিক চাপ বাড়ছে
দেশজুড়ে প্রায় ২০ লক্ষ এবং পশ্চিমবঙ্গে কয়েক লক্ষ শিক্ষক এই সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হতে পারেন বলে অনুমান। অনেকেই মাঝবয়সে এসে নতুন করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায়।
ডায়মন্ড হারবারের এক শিক্ষক বলেন,
“২০ বছর চাকরি করার পর আবার পরীক্ষা দেওয়ার কথা ভাবতেই মানসিক চাপ বাড়ছে। সংসার সামলে প্রস্তুতি নেওয়া সহজ নয়।”
সামনে কী পথ? টেট প্রস্তুতিই একমাত্র ভরসা
বিশেষজ্ঞদের মতে—
২০২৭-এর আগে অন্তত দু’টি বড় পরীক্ষা হতে পারে (CTET ও রাজ্য টেট)
দ্রুত প্রস্তুতি শুরু করাই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ
প্রয়োজনে ব্রিজ কোর্স বা প্রয়োজনীয় ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা উচিত
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্দোলন বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বদলে আইনি নির্দেশই চূড়ান্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উপসংহার
সংসদ ও সুপ্রিম কোর্ট— দুই স্তম্ভের অবস্থান এখন স্পষ্ট। ৩১ আগস্ট ২০২৭ ডেডলাইন শিক্ষক সমাজের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিজ্ঞতা বনাম যোগ্যতার আইনি সংজ্ঞা— এই বিতর্কের মাঝেই শিক্ষক পরিবারগুলির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আসন্ন পরীক্ষার ফলাফলের ওপর।
Tags :
TET 2026, RTE Act 2009, NCTE Notification 2010, Supreme Court TET Verdict 2025, 31 August 2027 Deadline, West Bengal Teachers News, TET Mandatory Update, Teacher Promotion Rule India, CTET 2026 Update

